তারেককে দেশে ফেরাতে ব্রিটেনের সঙ্গে চুক্তি করতে চায় সরকার

তারেককে ফেরাতে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে চুক্তি করতে চায় সরকার

আগের সংবাদ
শোকাবহ আগস্ট : বাঙালির কান্নার দিন আজ

শোকাবহ আগস্ট : বাঙালির কান্নার দিন আজ

পরের সংবাদ

আলাপচারিতা: মজিবর রহমান মাস্টার

খুনিদের বিদেশ থেকে ধরে এনে ফাঁসি দেয়া হোক

প্রকাশিত: আগস্ট ১৫, ২০২৩ , ১২:১০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ১৫, ২০২৩ , ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ
খুনিদের বিদেশ থেকে ধরে এনে ফাঁসি দেয়া হোক

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পেঁয়াজ-মরিচ-সরিষার তেল দিয়ে মুড়ি মাখাও খেয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান মাস্টার

বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন রংপুরের কৃতী সন্তান ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান মাস্টার। ৮৫ বছর বয়সি মজিবর রহমান এখন বিছানায় শুয়ে থাকেন। এখন তার চলাচলের একমাত্র বাহন হলো একটি হুইল চেয়ার। কিন্তু তার কণ্ঠ আজো তেজদ্বিপ্ত। তিনি এখনো দেশকে ভালোবাসেন, ভালোবাসেন বঙ্গবন্ধুকে।

মজিবর রহমান মাস্টারের বাড়ি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের পদাগঞ্জ গ্রামে। তার জন্ম ১৯৩৭ সালে। তিনি প্রয়াত সেরাজ উদ্দিনের ছেলে। মজিবর রহমান মাস্টারের দুই ছেলে মোস্তাফিজার রহমান মজনু ও মোস্তাকুর রহমান শিক্ষক ও প্রকৌশলী। মেয়ে মোনসেফা খানম গৃহিণী। অতি সম্প্রতি তার গ্রামের বাড়িতে কথা হয় এই ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে। আলাপচারিতায় উঠে আসে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ। আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে জানান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্যের স্মৃতিও। জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে তার প্রত্যাশা ও স্বপ্নের কথাও তুলে ধরেন প্রবীণ দেশপ্রেমিক।

মজিবর রহমান মাস্টার ১৯৫২ সালে বদরগঞ্জ থানা ঘেরাও করেছিলেন- সেই সময়ে ১১ জনের নামে মামলা হয়েছিল। তিনি আসামি ছিলেন। তিনি বদরগঞ্জে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জীতেন দত্ত, ইদ্রিস লোহানী ও ইউসুফ লোহানীর অনুপ্রেরণায় ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে যোগ দেন। সে সময় তিনি মেট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার সময় মজিবর রহমান শ্যামপুর হাইস্কুলে সহকারী শিক্ষক ছিলেন। ১৯৭১ সালে ঢাকার রেসক্রস ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর তিনি বদরগঞ্জে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। তিনি ওই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। আহ্বায়ক ছিলেন এমএলএ এলাহী বকস্ সরকার। তবে তাকে শ্যামপুর আঞ্চলিক সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক করা হয়েছিল।

‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’- এই তিনটি স্লোগানকে বুকে ধারণ করে ২৮ মার্চ মজিবর রহমান মাস্টারসহ হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে গিয়েছিলেন। সে সময় পাকহানাদারের গুলিতে অসংখ্য বাঙালি শহীদ হন।

এক এপ্রিল সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ক্যাপ্টেন আনোয়ারের নেতৃত্বে ৩ শতাধিক আনসার, পুলিশ ও সেনা সদস্য বদরগঞ্জে আসেন। সেই বহরে অংশ নেন মজিবর রহমান। বদরগঞ্জ থেকে তারা দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে যান। সেখানে গ্রেনেড দিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ শুরু করেন। বাবার কাছে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বিদায় নিয়ে ৬ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ক্যাপ্টেন নোয়াজেসের সঙ্গে তিনি নীলফামারীর চিলাহাটির ৩টি স্থানে গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন। পরে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের সঙ্গে কলকাতায় দেখা করেন। তার নির্দেশে তিনি ভারতের কুচবিহারের টাপুরহাট ইয়থ ক্যাম্পে সহকারী রিক্রুটিং অফিসার হিসেবে যোগ দেন।

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মজিবর রহমান বলেন, সালটা হবে ১৯৫৫। কিন্তু ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ভোট হলে মিঠাপকুরের এমপি হয়েছিলেন হাবিবুর রহমান চৌধূরী। তিনি এক বছরের মাথায় ইন্তেকাল করলে ওই আসনের উপনির্বাচনে ক্যাম্পেইনের জন্য ১৯৫৫ সালে রংপুরে আসেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী ও সে সময়কার তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। তারা শহরের ডাকবাংলোতে এসে আমাদের নিয়ে বসেছিলেন। তখনই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়। তারা একসঙ্গে পেঁয়াজ-মরিচ-সরিষার তেল দিয়ে মুড়ি মাখাও খেয়েছিলেন বলে জানান একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাষাসৈনিক মজিবর রহমান মাস্টার। এরপর যখনই রংপুরে বঙ্গবন্ধু এসেছেন ততবারই তাকে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন।

ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে মজিবর রহমান মাস্টার জানান, ১৯৪৮ সালে বদরগঞ্জ হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। তখন তিনি এলাকার লোকজনের সঙ্গে পাকিস্তানের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে দেখার জন্য ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে একটি সমাবেশে গিয়েছিলেন। ওই সমাবেশে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। তখন সবাই ‘নো নো’ বলে স্লোগান দিয়েছিল। এরপর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়েও একটি অনুষ্ঠানে একই ঘোষণা দেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। সেখানে ছাত্ররা তীব্র প্রতিবাদ করেন।

তিনি আরো বলেন, পরে রংপুরে ফিরে প্রথমেই রামনাথপুর গ্রামের ডাক্তার নাসিম স্যারের সঙ্গে পোস্টার লিখি- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। এরপর ইদ্রিস লোহানী ও ইউনুস লোহানীর বাড়িতে গিয়ে অবস্থান করি। বদরগঞ্জের তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জীতেন দত্ত, ইদ্রিস লোহানী ও ইউসুফ লোহানীর অনুপ্রেরণায় ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হই।

মজিবর রহমান বলেন, আমরা বিভিন্ন শহর ও গ্রামে, স্কুল-কলেজে ক্যাম্পেইন করি। যাতে ছাত্ররা আন্দোলনমুখী হয়ে ওঠে। বুড়িপুকুর, লালদিঘিরহাট, সয়ার খোঁড়াগাছ, শ্যামপুরে ক্যাম্পেইন করি। তখন সাধারণ মানুষও আন্দোলনের পক্ষে ছিল। সবাই মাতৃভাষা বাংলা চায়। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের পক্ষে আন্দোলন করায় জেলখানায় বন্দি ছিলেন। ওখান থেকে তিনি চিরকুট পাঠিয়ে দেন বাংলা ভাষার জন্য আমরা যেন আন্দোলন করি। আমি ১৯৫২ সালে মেট্রিক পরীক্ষার্থী। ভাষার দাবিতে আন্দোলন করায় আমার নামে ওয়ারেন্টও হয়।

এই ভাষাসৈনিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পর স্বাধিকার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুবাদে নাছোড়বান্দার মতো চষে বেড়ান সবখানে। সেই স্মৃতির কথা তুলে ধরে মজিবর রহমান বলেন, রংপুর মহকুমার সব জায়গায় আন্দোলন করেছিলাম। মতিউর রহমান মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭০ সালে ভোট ক্যাম্পেইনে রংপুর কালেক্টরেট ময়দানে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি তখন শ্যামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বঙ্গবন্ধুর ওই সভায় ছাত্র-শিক্ষকসহ অনেককে নিয়ে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ওই সভায় ছয়টা রুপার চান্দি (রুপার মুদ্রা) নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন বঙ্গবন্ধু আমাকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন- ‘তুমি এটা করলে কেন?’ আমি বললাম ৬ দফাকে স্মরণ রাখার জন্য এটা করছি। তখন বঙ্গবন্ধু আমার পিঠে থাপ্পড় দিয়ে বলেছিলেন- ‘সাবাস সাবাস।’
শোকাবহ আগস্টের কথা শুনলে আজো তার বুক কেঁপে ওঠে। কেননা সর্বশেষ ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শেষ দেখা হয় তার। রংপুরের একটি বিষয় নিয়ে ঝামেলা হওয়ার কারণে স্থানীয় এমপি আব্দুল আউয়ালের নেতৃত্বে মজিবর রহমান মাস্টারসহ আরো কয়েকজন ঢাকায় দেখা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে।

তিনি আজো বিশ্বাস করেন, এই আগস্টে বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের অন্য সদস্যদের যারা হত্যা করেছে, তাদের সবারই ফাঁসি কার্যকর হবে। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে ধরে এনে আসামিদের ফাঁসি কার্যকর করার দাবি জানান তিনি। বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলা চেয়েছিলেন- তা প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

মজিবর রহমান মাস্টার যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসরামীর কেন্দ্রীয় নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামের মামলায় সাক্ষী ছিলেন। তাকে বহুবার হুমকি দেয়া হয়েছিল। তা উপেক্ষা করে তিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন। এই আজহারের বাাড়ি তার পাশের গ্রামে। স্বাধীনতার পর তিনি বিসিআইসি চেয়ারম্যান ছিলেন কয়েক বছর। তিনি স্কাউটস আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি পদক।

তিনি ১৯৬৯ সাল থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত বদরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মজিবর রহমান। বাকশাল গঠনের পর তিনি দীর্ঘদিন রংপুর জেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি বদরগঞ্জ শাখা টিসিসির চেয়ারম্যান ছিলেন। সে সময় তিনি বদরগঞ্জের কুতুবপুর ইউপি চেয়ারম্যানও ছিলেন।

গত ২ আগস্ট রংপুর জিলা মাঠে আওয়ামী লীগের বিভাগীয় সমাবেশে যোগ দিতে এসে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা হয় মজিবর রহমান মাস্টারের। সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমার মেয়ের মতো, তাকে আমি কাছে পেয়ে দোয়া করে দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী যেন দেশ শাসনে ভালো করতে পারেন। তার বাবার ডাকে যুদ্ধ করেছি, আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী, এটাই তো আমাদের গর্ব। মজিবর মাস্টার বলেন, আল্লাহর কাছে প্রধানমন্ত্রীর জন্য দোয়া করছি, তিনি যেন আরো ভালো কাজ করতে পারেন। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে যেন একটা উন্নত দেশে পরিণত করতে পারেন।

ভাষা আন্দোলনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদক-২০২৩ পান রংপুরের কৃতী সন্তান ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান মাস্টার।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালে ভোরের কাগজ পত্রিকার রংপুর বিভাগীয় সম্মেলনে মজিবর রহমান মাস্টারকে ভাষাসৈনিক হিসেবে সম্মাননা পদক প্রদান করা হয়েছিল। জেলা পরিষদ কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে তৎকালীন সংসদ সদস্য আনিসুল ইসলাম মন্ডল ও ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত উপস্থিত ছিলেন।

ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়