নির্বাসিত তারুণ্য

আগের সংবাদ

রূপান্তরের অপরূপ কথা

পরের সংবাদ

শুভবোধ উদয় হোক সংকট উত্তরণে

সেলিম রেজা

কবি, লেখক ও সম্পাদক

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৯ , ৭:৫২ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৯ , ৭:৫২ অপরাহ্ণ

যতই আধুনিক হচ্ছে সমাজ ততই মূল্যবোধে অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে। উচ্ছৃঙ্খলতা দিন দিন বেড়ে চলছে, প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত নিজ সন্তানের বন্ধু নির্বাচন যেন উনারাই করে দেন। এতে করে সামাজিকতা রক্ষা হবে এবং অনৈতিক কার্যকলাপ থেকে যুব সমাজ নিজেদের দূরে রাখতে পারবে। বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে যেন হতাশা-বিষাদগ্রস্ত না হয়, যদিও হয়ে পড়ে তার সঠিক ব্যাখ্যা বের করে দ্রুত সমাধান দেয়া।

আমাদের চারদিকে শুধু স্বার্থপরতা, নীতিহীনতা, বিদ্বেষ ও হানাহানি। আমরা যে তিমিরে ছিলাম, শতবর্ষ পরেও সে তিমিরেই রয়ে গেছি। এটি একটি পরিতাপের বিষয় যে, এখন এর অন্তরাল দূর করতে আমরা ব্যর্থ। এখনো অনুভব করা যায় অনেকের মনের গভীরে মাকড়সার জাল, ধুলোবালি, ঘুণে ধরা যতসব ফন্দি, বিনাশের মূলমন্ত্র প্রোথিত। এটা সুচিন্তিত পলিসি অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর কিংবা নিছক ব্যর্থ প্রয়াস।

জীবনধারা বদলে যাচ্ছে; শুধু বদলাচ্ছে না সেকেলের যতসব ফন্দি, চুলছেঁড়া বিশ্লেষণে মত্ত অনেকে সমাজে আধিপত্য বিস্তার, বৈষম্য, ভোগবাদ, স্বার্থবাদী চাতুর্যে অনেকে আসীন। আবার অনেকে অজ্ঞতা সারল্য নীতিবোধের কারণে অত্যাচারিত প্রতিনিয়ত-প্রতিক্ষণ।

এ জন্য দরকার শিক্ষার ব্যাপ্তি। যুক্তির বিস্তার ও চেতনার প্রসার। তাহলে বিচারের বাণী ধুলোয় গড়াগড়ি খাবে না। তাই আমাদের উচিত মানুষ হবার সংকল্প মনে গেঁথে অহংকেন্দ্রিকতা থেকে বিশ্ব চেতনায় আত্মপ্রসার লাভ করা। জ্ঞানার্জনের এক প্রধান উপায় আমরা প্রকৃতি থেকে পেয়ে থাকি।

অস্তিত্বের বিশুদ্ধ স্বীকৃতির জন্যে আকাক্সক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। এই আকাক্সক্ষা মানব প্রকৃতির এক মূল উপাদান। তবে এর পাশাপাশি মানুষের আছে অন্য এক প্রবৃত্তি, যা চেতনাকে প্রসারিত করার বাসনা জোগায়। ব্যক্তির সীমাবদ্ধ অস্তিত্বের বহিঃসীমানায় অবস্থানরত মানুষের সাথে যোগ স্থাপনের অদম্য ইচ্ছা জাগে সবার।

এই ইচ্ছা অনেকটা জাগতিক প্রয়োজনে। হতে পারে গোষ্ঠীবদ্ধ আত্মরক্ষার সংগঠন, ভ্রাতৃত্ববোধ রক্ষণ, উন্নয়নমূলক সংগঠক অথবা ব্যবসায়িক, হৃদয়ের সাথে অন্য হৃদয়ের, অন্তরে অন্তরীক্ষে বিমুগ্ধ যোগের তৃষ্ণা মানুষের এক অন্তর্গত ধর্মে রূপ নেয়। আবার অনেকটা দ্বিধাগ্রস্ত। ভুলের বিচরণ অবাধ।

সময়ের ঘূর্ণিচক্রে আমাদের অধিকার কখনো প্রতিষ্ঠিত হয়, কখনো বা বঞ্চিত হতে হয় নিন্দুক, মূর্খ, জ্ঞানীর লেবাসে কথা বিশারদদের সের দরে বেচা কথা ও উপমার নুন-চিনির মতো। এমন না যে, উনি উচ্চ শিক্ষায় গবেষক কিংবা কোনো ডিগ্রিধারী ঝন্টু সাহেব।

তবুও কথার ফুলঝুরিতে প্রতিদিন বেচাকেনা করেন সাধারণ মানুষদের, বিবেক-মেধা ও মননকে বেচেন বাজারমূল্যে। এখন সমাজ সংসারে অভব্যদের ঠাসাঠাসি, অসহনশীলতায় অনেকেই দুনালী বন্দুক বা ধারালো তলোয়ার খুলে নেয় প্রতিপক্ষের মোকাবিলায়।

এতে আমি সহমত নই। মতামত খণ্ডন শুধু মতামত ও যুক্তি দিয়ে। শিল্পী যেমন তাঁর নিজস্ব ভুবনে শিল্প সাধনায় আত্মমগ্ন হয়ে শিল্প সৃষ্টি করেন তেমনি কবিও তাঁর নিজস্ব চিন্তা-ভাবনায় শৈল্পিক নৈপুণ্যে সৃষ্টি করেন কবিতা।

কবি তাঁর কবিতার ছন্দে প্রকৃতি, পৃথিবী, মানুষের স্বপ্নের আশা-আকাক্সক্ষা, সমাজের গতি, শক্তি ও মাত্রা নির্মাণ করে কালজয়ী ভূমিকা স্থাপন করতে পারে। শিল্প সৃষ্টিতে শিল্পীরা সর্বদা উন্মুক্ত, উদার ও শান্ত পরিবেশ খুঁজে বেড়ায়। স্বাধীন চেতনায় তারা আঁকতে পারে- যেমন ইচ্ছা তেমন করে।

এরা অনেকেই শিল্প চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করে মূল শিল্প চর্চায় নিজস্ব দেশীয় ধারাবাহিকতা সৃষ্টিতে অনন্য অবদান রাখছেন। তদ্রুপ একজন সুসাহিত্যিক সফল সাহিত্য রচনা করে তথাকথিত সমাজের কল্যাণে এগিয়ে আসতে পারে।

প্রবন্ধকার তাঁর দক্ষ লেখনী শক্তি দিয়ে আমাদের আশপাশের পরিবেশ, সমাজ, দেশ ও জাতির কল্যাণে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে নিঃসন্দেহে। তেমনি সত্য প্রকাশে নির্ভীক সাংবাদিকরাও বস্তুনিষ্ঠ গঠনমূলক সংবাদ পরিবেশনে পাশ কাটিয়ে যাওয়া, সত্যতা প্রকাশে কার্পণ্য করা, ফিচার বা ঘটমান খবর সংক্ষেপে কিংবা আত্তীকরণ অজুহাতে ছাপা বা প্রকাশ করা নিন্দনীয় অপরাধ।

অনেকক্ষেত্রে প্রতিহিংসার জের ধরে কোনো ব্যক্তির নাম কাটছাঁট করা, হাতেগোনা কয়েকজন সাংবাদিকদের এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই হীন মনমানসিকতা থেকে উঠে আসতে পারলেই সংবাদপত্র বা সাংবাদিকতার কদর বাড়বে।

ভার্চ্যুয়াল অন্তর্জালেও চলছে মিথ্যাচার, ফেইক চিন্তাভাবনায় নিজের কূটচালে অন্যকে খাটো করা, হরদম মুখোশের ভেতর আরেক মুখোশ বেরিয়ে আসছে। টিনের চশমা পরে যেন আমরা রীতিমতো পথে হাঁটছি, দেখেও না দেখার ভান ইদানীং অহরহ চোখে পড়ছে।

হামবড়া ভাব আমাদের নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারগলিতে, রাতজেগে চলে অতিক্রম করার জল্পনা-কল্পনা; কর্পোরেট বিপণন পুঁজির নগ্ন শিকার আমাদের সুপ্ত মগজ। পরাজয় খেলায় নিজেকে বানাচ্ছে সময়ের মুসাফির। সস্তায় নামী-দামী হবার পাঁয়তারা এখন হালের ক্রেজ।

তবে আশার বাণী, বর্তমানে আমাদের বাংলা সাহিত্যের রূপরেখায় বৈচিত্র্যময় উপস্থাপন মৌল অনুষঙ্গ হিসেবে চতুর লেখকরা সমাজ ব্যবস্থাপনা, নৈসর্গ-প্রকৃতি, সমাজ সংস্কারের পটভূমি ও নিয়ন্ত্রণ, বিনির্মাণ, রাজনীতি ইত্যাদি আঁকড়ে ধরে প্রবাহমানতার সূত্র হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে।

মানুষের চলমান জীবনের স্বাভাবিকতা আজ রুদ্ধ, বিবর্তনের ধারা পারিপার্শ্বিক রূপ বদলে দিচ্ছে। সমাজের অলি-গলি দুরন্ধর ধান্দাবাজদের ভেলকিবাজির জাঁতাকলে মানুষ নির্যাতিত ও নিষ্পেশিত হয়েছে-হচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপট আমাদের অন্তর্লোককে এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

স্বার্থাম্বেষী ও কুচক্রীমহলের দাপটে সাধারণ মানুষ আজ দিশাহারা। আমরা যদি শুভবোধ উত্তরণের লক্ষে কিছুটা সচেতন হতে পারি তাহলেই সমাজ মুক্তি পাবে ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ড থেকে। যেমন- অতিকথন অনেক সময় সমস্যায় ফেলে, ঝগড়া বা বিবাদে জড়ায়।

এমনকি ব্যক্তি থেকে সমষ্টিগত পর্যায়ে ঘটনার মোড় নেয়, মানহানি ঘটে কিংবা এর থেকেই চরম আকার ধারণ করে। তাই সবার উচিত মার্জিত, সুন্দর সদালাপ যেন আমাদের প্রতিদিনের কথোপকথনে বিরাট ভূমিকা পালন করে।

কেউ কাউকে হেয়পতিপন্ন করার সময় যেন ভাবেন হয়তবা আগামীতে উনার জন্যও অপেক্ষা করছে এর থেকেও বিরাট সম্মানহানিকর কোনো বিষয়। আমাদের উচিত রোজনামচায় বিনয়-ভ্রাতৃত্ব তথা শিষ্টাচার বজায় থাকে এমন আচরণ যেন আমরা পরিবারে, সমাজে সব সময় করি।

রাজা সলোমানের বিখ্যাত বাণী- ‘অহঙ্কার মানুষের পতন ঘটায়, কিন্তু বিনয় মানুষের মাথায় সম্মানের মুকুট পরায়’। ছোটদের ক্ষেত্রেও আমরা যেন বেশি বেশি আমলে আনি এইসব শিক্ষা। আদব লেহাস যেন আমরা পরিবার থেকেই শিখায়, তাহলে অনেক শিশুই ছোট থেকে বড় হতে হতে বেসিক শিষ্টাচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে।

যতই আধুনিক হচ্ছে সমাজ ততই মূল্যবোধে অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে। উচ্ছৃঙ্খলতা দিন দিন বেড়ে চলছে, প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত নিজ সন্তানের বন্ধু নির্বাচন যেন উনারাই করে দেন। এতে করে সামাজিকতা রক্ষা হবে এবং অনৈতিক কার্যকলাপ থেকে যুব সমাজ নিজেদের দূরে রাখতে পারবে।

বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে যেন হতাশা-বিষাদগ্রস্ত না হয়, যদিও হয়ে পড়ে তার সঠিক ব্যাখ্যা বের করে দ্রুত সমাধান দেয়া। নতুবা বন্ধুমহলে বিষক্রিয়ার মতো ছড়িয়ে পড়বে নেশাজাতীয় দ্রব্য মস্তিষ্কের ওপর বিরূপ ক্রিয়া যা তিলে তিলে তাদের মৃত্যুর মুখে পতিত করবে।

পর্নো বা বিকৃত রুচির সিনেমা, ইউটিউব, ভিডিওক্লিপ যেন তাদের হাতের নাগালে না আসে কিংবা এসবে আসক্ত হয় এমন পরিবেশ যেন সৃষ্টি না করে অভিভাবকরা। কেননা নৈতিক স্খলনে হিংস্রতা পৈশাচিকতা বাড়ে, ধর্ষণ ও অন্যান্য জঘন্য কার্যকলাপ মাথা চাড়া দিয়ে উঠে।

তাই মানুষের শুভবোধ উদয় হোক, সুরাহা হোক সংকট উত্তরণে। যেন এলোমেলো না হয় সাজানো সমাজ সংসার, একমুঠো অবিশ্বাস যেন শীর্ণ করতে না পারে আমাদের স্বর্ণালি মঞ্জিল।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়