শুভবোধ উদয় হোক সংকট উত্তরণে

আগের সংবাদ

মগবাজার ফ্লাইওভার থেকে পড়ে যুবকের মৃত্যু

পরের সংবাদ

শতবর্ষের মাইজভাণ্ডারী গান

রূপান্তরের অপরূপ কথা

নাসির উদ্দিন হায়দার

সাংবাদিক ও লোকসাহিত্য গবেষক

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৯ , ৮:১৮ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৯ , ৮:১৮ অপরাহ্ণ

বরেণ্য আলেম বজলুল করিম মন্দাকীনি মাইজভাণ্ডারের প্রেমসাগরে ডুব দিয়ে নিজেকে জলাঞ্জলি দেওয়ার মর্সিয়া গেয়েছেন উপরিউক্ত গানে। তৎকালীন সময়ে পীর-মুর্শিদের প্রেমে উতালা হয়ে একজন আলেমের গান লেখা, গানবাজনায় (সেমা) মত্ত হওয়া অনেকটা সমাজচ্যুত হওয়ার শামিল। হয়তো মাইজভাণ্ডারী তরিকায় দাখিল হওয়ায় তখন মাওলানা করিমকে সমাজ ও ধর্মের ধ্বজাধারীদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সইতে হয়েছে। তাই তিনি সবকিছুকে তুচ্ছ করে সমাজদ্রোহী হয়েছে উঠেছেন, মৌলবাদের ভ্রান্ত দৃষ্টিতে কিছুটা ধর্মদ্রোহীও। তাইতো তিনি সুফিগণের (তথাকথিত ধার্মিক) উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমি শরাবি (মদমত্ত) পথে নেমেছি, তোমরা যত ভালো মানুষ সরে দাঁড়াও। নয়তো তোমাদের দামি পরিধেয় (ছুফীতন) নষ্ট হতে পারে।’ ওই গানে সমাজ ও ধর্মের ধ্বজাধারীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমরা সুখে বেহেস্তে যাবে, তু-হুর গেলমা কত কি পাবে/আমি বেচারা প্রেমেরি মরা, ঘুরে বেড়াব গহন কানন।’ সত্যি, মাইজভাণ্ডারের প্রেমসাগরে, যুগে যুগে অসংখ্য ‘প্রেমের মরা’ ঘুরে বেড়িয়েছেন, গানে গানে সুরে সুরে মুর্শিদের প্রশস্তি গেয়েছেন, প্রেমাষ্পদের একটুকু ভালোবাসার কাঙাল হয়ে সারাটি জীবন পার করেছেন।

মাইজভাণ্ডারী গান যেন প্রেমসাগরের অরূপরতন, ভালোবাসার এক অলৌকিক শিল্প। মাইজভাণ্ডারী তরিকার সাধনমার্গের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে এই গানের উদ্ভব। কিন্তু শতবর্ষের পথপরিক্রমায় মাইজভাণ্ডারী গান সাধনমার্গের স্বীয় গণ্ডি অতিক্রম করে বাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক চাহিদা পূরণে সমর্থ হয়েছে, এই গান হয়ে উঠেছে আবহমান বাংলার লোকসঙ্গীতের সখা। বলতে গেলে মাইজভাণ্ডারী গান লোকসঙ্গীতে এক ব্যতিক্রমী ও অভূতপূর্ব ধারা সৃষ্টি করেছে।

কিন্তু সাধনমার্গ থেকে মাইজভাণ্ডারী গানের লোকসঙ্গীতে রূপান্তর হলো কীভাবে? উত্তর হলো, মাইজভাণ্ডারী দর্শন বাঙালির জাতিসত্তার মর্মমূল থেকে উদ্ভূত এবং তা সুফি সভ্যতা বা নৈতিক মানবধর্মের আদর্শ দ্বারা মহিমান্বিত।

এই সুফি সভ্যতা বা নৈতিক মানবধর্ম দেশ-কাল ও জাতি-ধর্মের গণ্ডিমুক্ত। ফলে মাইজভাণ্ডারী দর্শন ও গান জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষুধা নিবারণে সমর্থ হয়েছে। সাধনমার্গ থেকে মাইজভাণ্ডারী গানের লোকসঙ্গীতে রূপান্তরের পেছনে এটাই সবচেয়ে বড় কারণ বলে ধারণা করা যায়।

আর সাধনমার্গ থেকে মাইজভাণ্ডারী গানকে আমজনতার গানে পরিণত করার প্রধান দুই কারিগর হলেন কবিয়াল রমেশ শীল (১৮৭৭-১৯৬৭) ও আবদুল গফুর হালী (১৯২৮-২০১৬)। আর মাইজভাণ্ডারী গানের বিশ্বায়নের মূল নায়ক হলেন শিল্পী মোহাম্মদ নাসির।

১৯৩২ সালে এইচএমভি থেকে জগন্ময় মিত্রের সঙ্গীত পরিচালনায় মোহাম্মদ নাসিরের মাইজভাণ্ডারী গানের রেকর্ড বের হয়েছিল। বলতে গেলে তার হাত ধরেই চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্ব পরিম-লে মাইজভাণ্ডারী গান ছড়িয়ে পড়ে।

রমেশ শীল মাইজভাণ্ডার দরবারে যাতায়াত শুরু করেন ১৯২৩ সালের দিকে। মাইজভাণ্ডারী গানের বুলবুল হিসেবে পরিচিত টুনু কাওয়াল এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। (সূত্র- গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী, শতবর্ষের আলোকে- ড. সেলিম জাহাঙ্গীর, পৃষ্ঠা-২৮৮)।

রমেশ যখন মাইজভাণ্ডারের প্রেমে পড়েন তখন গদিনসীন পীর ছিলেন মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রবর্তক সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর ভ্রাতুস্পুত্র ও খলিফায়ে আজম সৈয়দ গোলামুর রহমান প্রকাশ বাবা ভাণ্ডারী (১৮৬৫-১৯৩৭)।

কবিয়াল রমেশ শীল প্রায় ৩০০ মাইজভাণ্ডারী গান লিখেছেন। তার মধ্যে শিল্পী ফিরোজ সাঁইয়ের কণ্ঠে এই গানটি সবচেয়ে জনপ্রিয়

চলরে মন ত্বরাই যাই, বিলম্বের আর সময় নাই
গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী স্কুল খুলেছে।
সেই স্কুলের এমনি ধারা, বিচার নাই জোয়ান বুড়া
ছিনায় ছিনায় লেখাপড়া শিক্ষা দিতাছে।
(জীবনসাথী-কবিয়াল রমেশ শীল)

অন্যদিকে আবদুল গফুর হালী ১৯৫৫/৫৬ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত টানা ৬০ বছর মাইজভাণ্ডারী গান রচনা, কণ্ঠদান ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। এই সময়ে তার রচিত গানের সংখ্যা প্রায় সহস্রাধিক। গত ৬০ বছরে মাইজভাণ্ডারী গানকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে গফুর হালীর অবদান অতুল্য। গত ছয় দশকে দরবারি ও বাণিজ্যিক পরিমণ্ডলে গফুর হালী রচিত গানই সর্বাধিক সমাদৃত ও জনপ্রিয়। তার মাইজভাণ্ডারী গান নিয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে মূল্যবান গবেষণা হচ্ছে।

আবদুল গফুর হালী রচিত, শিল্পী কল্যাণী ঘোষের গাওয়া নিচের গানটি সবচেয়ে জনপ্রিয়…
দেখে যারে মাইজভাণ্ডারে হইতেছে নূরের খেলা
নুরী মওলা বসাইল প্রেমের মেলা॥
আল্লাহু আল্লাহু রবে নানান বাদ্য শোনা যায়
গাউছুল আজম শব্দ স্বরে আশেকগণে হুঁশ হারায়
জিকিরেতে আকাশ বাতাশ করে আল্লাহু আল্লাহ।।
(আবদুল গফুর হালীর গীতিকাব্য সুরের বন্ধন, সম্পাদনা : নাসির উদ্দিন হায়দার)

আসলে মাইজভাণ্ডারী গান ইসলামি ধর্মদর্শন ও ধর্মসঙ্গীত রূপে সৃষ্ট হয়ে মৌলিকভাবে ধর্মীয় অনুষঙ্গ ও বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষুধা নিবারণ করে আছে। শতাব্দীকাল ধরে ‘মাইজভাণ্ডারী সংস্কৃতি’ বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। ফলে এই গান সহজেই সাধনমার্গ বা দরবারি মজলিশ থেকে বের হয়ে জনমানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

মাইজভাণ্ডারী গানের ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উত্থাপন করা যায়। বাংলা গানের ধারায় হাজার বছর ধরে যারা গান রচনা করেছেন সে গান তাদের নিজের নামেই পরিচিত। ওইসব গীতিকার ও সুরকারের জীবনাবসানের পর ওই গানের ধারারও সেখানেই সমাপ্তি হয়েছে। কিন্তু শুধু মাইজভাণ্ডারী গানই ব্যতিক্রম।

মাইজভাণ্ডারী তরিকার যারা প্রবর্তক বা পরবর্তীতে গদিনসীন পীর হয়েছেন তারা কিন্তু কেউ গান রচনা করেননি বরং তাদের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে আশেক-ভক্তরাই অজস্র গান রচনা করেছেন এবং শত বছর ধরে সেই ধারা প্রবাহমান। মাইজভাণ্ডারী গানের এটাই ব্যতিক্রমী বিশেষত্ব।

মাইজভাণ্ডারী গান মারফতি ও মুর্শিদী ঘরানার। লোকসঙ্গীতের ধারায় এই দুই ঘরানার গান সৃষ্টিকর্তাকে উপলক্ষ করে রচিত হলেও মাইজভাণ্ডারী গানে স্রষ্টার বদলে পীরের মাহাত্ম্যই মুখ্য। দিল্লি ও আজমিরে খাজা নিজামউদ্দীন আউলিয়া ও খাজা মঈনউদ্দীন চিশতীর দরবারের ধর্মীয় সঙ্গীত ধারার সঙ্গেও যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় মাইজভাণ্ডারী গানের।

ড. মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, “মাইজভাণ্ডারের দরগাহে ‘হালকা’ ও ‘সিমা’ প্রায় সবসময়, বিশেষত বার্ষিক মেলার (উরস) সময় সমারোহ সহকারে অনুষ্ঠিত হয়। এ দুটি অনুষ্ঠান এখন এখানকার ‘মস্তানদের’ (প্রমত্তদের) একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘হালকা’ বা বৃত্তাকারনর্তন মৌলানা রুমী প্রবর্তিত ‘মৌলবি’ সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য আর ‘সিমা’ বা সঙ্গীত-সাহায্যে মহিমা কীর্তন চিশতীয়া খান্দানের বৈশিষ্ট্য।” (প্রবন্ধ : মাইজভাণ্ডারের মৌলানা শাহ্ আহমদুল্লাহ্ ও তার সাধনার সংক্ষিপ্ত পরিচয়, সম্পাদক সৈয়দ সহিদুল হক)।

আসলেই চিশতীয়া ও মাইজভাণ্ডারী তরিকার সম্মোহনী শক্তির নেপথ্যে রয়েছে অসাম্প্রদায়িক মানবধর্মের চেতনা। আর এই চেতনার মূল উপজীব্য হলো সিমা (সেমা) মাহফিল বা গানবাজনা।

অন্যদিকে চর্যাগীতিকা, বৈষ্ণব পদাবলী ও বাউল সঙ্গীত ধারার সঙ্গেও মাইজভাণ্ডারী গানের সাদৃশ্য লক্ষণীয়। একক কোনো পদকর্তার নয়, অনেক গীতিকারের সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ উপরিউক্ত তিন সঙ্গীত ধারা। যেমন চর্যাগীতিকায় কাহ্নপা, লুইপা, বৈষ্ণব পদাবলীতে চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস এবং বাউল সঙ্গীতে লালন, পাঞ্জুশাহ, দুদ্দুশাহ হলেন উল্লেখযোগ্য পদকর্তা।

তেমনি মাইজভাণ্ডারী গানের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য গীতিকার হলেন, মাওলানা আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরী, মাওলানা বজলুল করিম মান্দকীনি, আবদুল্লাহ বাঞ্ছারামপুরী, রমেশ শীল ও আবদুল গফুর হালী। তাদের মিলিত সৃষ্টিতেই সমৃদ্ধ মাইজভাণ্ডারী গান।

আসলে মাইজভাণ্ডারী গানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা। আর এ কারণেই এ গান সাধনমার্গের স্বীয় সীমাবদ্ধ গণ্ডি অতিক্রম করে আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক চাহিদা পূরণে সমর্থ হয়েছে। এখানে অবশ্যই রমেশ শীলের কৃতিত্ব অনন্য।

কারণ রমেশই মাইজভাণ্ডারী গানকে দরবারি মজলিশ থেকে বের করে এনে সাধারণ শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেন। এক্ষেত্রে তাকে লালন সঙ্গীত-সাধক অমূল্য শাহের সঙ্গে তুলনা করা যায়। অমূল্য শাহ লালন সঙ্গীতকে তাল-মাত্রায় ফেলে গাইবার নিয়ম প্রবর্তন করেছিলেন, অনুরূপভাবে রমেশ শীলও মাইজভাণ্ডারী গানকে তাল-মাত্রায় ফেলে গাইবার পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। তাই রমেশ শীলের মাইজভাণ্ডারী গানগুলো উচ্চমার্গীয় সাধনসঙ্গীত হিসেবে রচিত হলেও তা সর্বস্তরের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।

যতদূর জানা যায়, শতাব্দীকাল ধরে শতাধিক গীতিকারের প্রায় ৫ সহস্রাধিক মাইজভাণ্ডারী গান বাংলার লোকসঙ্গীতের ধারাকে ঋদ্ধ করেছে। এ পর্যন্ত ১১৮টি মাইজভাণ্ডারী গানের বইয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে। তার মধ্যে ৮৬টি বইয়ে গানের সংখ্যা ৪৪৮৮টি।

এ ছাড়া পাণ্ডুলিপি সংগৃহীত হয়েছে পাঁচটি, যাতে গান রয়েছে ৩২৮টি। সব মিলিয়ে সংগৃহীত গানের সংখ্যা ৪৮১৬টি। (সূত্র-আঞ্জুমানে মোত্তাবিয়ানে গাউছে মাইজভাণ্ডারী সাংস্কৃতিক পরিষদ)। সত্তরের দশক থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কয়েকশ অডিও অ্যালবাম বের করেছে। একাধিক গ্রামোফোন রেকর্ড বের হয়েছে।

এসবের বাণিজ্যিক সাফল্য দারুণ। তবে এটাও ঠিক সাম্প্রতিক ইন্টারনেট ও মোবাইল আগ্রাসনের কারণে অডিও ব্যবসায় ধস নামার পর অন্য সব গানের মতোই মাইজভাণ্ডারী গানের বাণিজ্যিক সাফল্যে ভাটা পড়েছে। তবে দরবার শরিফের ওরশ-কেন্দ্রিক মাইজভাণ্ডারী গানের জলুস এতটুকু কমেনি, বরং দিনদিন বাড়ছে। পাশাপাশি বেতার-টেলিভিশন-ইউটিউবের মাধ্যমে ভিন্ন আঙ্গিকে এই গানের প্রসার অব্যাহত রয়েছে।

মাইজভাণ্ডারী গানের জনপ্রিয় কয়েকজন শিল্পী হলেন আবদুল গফুর হালী, শেফালী ঘোষ, টুনু কাওয়াল, ফকির আলমগীর, সঞ্জিৎ আচার্য, কল্যাণী ঘোষ, কান্তা নন্দী, ফিরোজ সাঁই, সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, জানে আলম, শাক্যমিত্র বড়–য়া, মুলকুতুর রহমান, কল্পনা লালা, আবদুল মান্নান, আহমদ নূর আমিরী, সেলিম নিজামী, শিমুল শীল, মমতাজ,শরীফ উদ্দিন, নাছির কাওয়াল, সৈয়দ আদিল মাহবুব আকবরী, জাহেদ সরোয়ার প্রমুখ।

উল্লেখ্য, ’৭০-এর দশকে মুক্তিযুদ্ধের পর সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ছাপ দেখা যায় মাইজভাণ্ডারী গানেও। রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম বেতার-টেলিভিশনে এই গানের সুর ও উপস্থাপনাতে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। সঙ্গীতের বাণিজ্যিকীকরণেও মাইজভাণ্ডারী গান প্রাধান্য পেতে থাকে।

তবে বেতার-টেলিভিশন ও ক্যাসেটে মাইজভাণ্ডারী গানের গায়কী ও ঢং নিয়ে দরবারের ধারকরা অসন্তুষ্ট। তাদের কথা এতে সাধন সঙ্গীতের মেজাজ ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়।

এ প্রসঙ্গে মাইজভাণ্ডারী আওলাদ সৈয়দ দিদারুল হকের মন্তব্য-‘মাইজভাণ্ডারী গান নিয়ে ফকির আলমগীর, ফিরোজ সাঁই এরা আনন্দ করে, মাইজভাণ্ডারী গান তামাশা করার বিষয় নয়।’ (সূত্র-গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী, শতবর্ষের আলোকে-ড. সেলিম জাহাঙ্গীর)।

মাইজভাণ্ডারী গানের উদ্ভব হয়েছিল কীভাবে?

মাইজভাণ্ডারী গানের সৃষ্টি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে। এই গানের প্রথম গীতিকার কে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে ১৩৬৫ বাংলা সনে ‘আল মাইজভাণ্ডারী’ পত্রিকায় মৌলবী বজলুর রহমান বিএবিটি ‘মাইজভাণ্ডারী গান’ প্রবন্ধে মাওলানা আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরীকেই এ গানের উদ্ভাবক বলে অভিহিত করেছেন।

মাওলানা শাহ সুফি দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী লিখিত ‘গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর জীবনী ও কেরামত’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, ‘সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর সামনে বসে গায়ক গুরুদাস ফকির নামে এক ভক্ত খঞ্জরি বাজিয়ে বৈরাগী সুরে তাকে গান শুনাতেন।’

পরে ভক্তরাই গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীকে নিয়ে গান রচনা করেন এবং তা দরবারি মজলিশে গাইতে থাকেন। কালক্রমে এই গান মাইজভাণ্ডারী গান হিসেবে পরিচিতি ও খ্যাতি লাভ করে। এই গানে স্বতন্ত্র সুর, ঢং ও গায়কী তৈরি হয়।

পরে মাওলানা আবদুল হাদী, বজলুল করিম মন্দাকীনি, আবদুল্লাহ, আবদুল গণি কাঞ্চনপুরী, রমেশ শীল, আবদুল গফুর হালী ও অন্য রূপকারদের মাধ্যমে দেশজুড়ে মাইজভাণ্ডারী গানের উত্থান ও সমৃদ্ধি হয়।

উদ্ভব ও বিকাশ পর্যায়ে মাইজভাণ্ডারী গানের বাদ্যযন্ত্র কেমন ছিল? একটি গানে প্রাথমিক পর্যায়ের বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

ধুমধুমি করতাল শব্দ, পাতালে বাসুকী স্তব্ধ।
স্বর্গে যত অপ্সরা গাউসুল আজম জপে তারা।।
বেলা সারিন্দা বাজে, মৃদঙ্গ মন্দিরা সাজে।
হারমোনি সেতারের তানে আশেকী হয় মাতোয়ারা।।

এই গানে হারমোনি, সেতার, সারিন্দা, মৃদঙ্গ, মন্দিরা ও বেহালা ছয় প্রকার বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে সবসময় সব গানে সব বাদ্যযন্ত্র বাজানো হতো কিনা তা নিশ্চিত জানা যায় না।

শতবর্ষে মাইজভাণ্ডারী গানের ক্রমবিকাশের ধারাকে তিন পর্বে ভাগ করা যায়। পর্ব তিনটি হলো- উদ্ভব পর্ব, বিকাশ ও সমৃদ্ধি পর্ব।

উদ্ভব পর্ব : মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রবর্তক সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর (১৮২৬-১৯০৬) শানে রচিত গান

বিকাশ পর্ব : সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর ভ্রাতুষ্পুত্র ও খলিফায়ে আজম সৈয়দ গোলামুর রহমান প্রকাশ বাবা ভাণ্ডারীকে (১৮৩৫-১৯২৭) কেন্দ্র করে রচিত গান

সমৃদ্ধি পর্ব : সাম্প্রতিককালে সৈয়দ দেলাওর হোসাইন (১৮৯৩-১৯৮২), সৈয়দ শফিউল বশর, সৈয়দ জিয়াউল হকের (১৯২৮-১৯৮৮) শানে রচিত গান।

উদ্ভব পর্বের গানের উল্লেখযোগ্য রচয়িতা হলেন মাওলানা আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরী, মাওলানা বজলুল করিম মন্দাকীনি, মনমোহন দত্ত, আবদুল্লাহ বাঞ্ছারামপুরী ও রায়হান প্রমুখ। উদ্ভব পর্বে বাদ্যযন্ত্র ছিল খঞ্জরি ও জুরি। তাল রক্ষার জন্য গানের সঙ্গে হাততালি দেওয়ার রেওয়াজ ছিল।

বিকাশ পর্বের প্রধান রচয়িতা হলেন রমেশ শীল। আর ওই পর্বের দিকপাল শিল্পী হলেন মোহাম্মদ নাসির ও টুনু কাওয়াল। আর সমৃদ্ধি পর্যায়ের গুণী রচয়িতা হলেন আবদুল গফুর হালী, এম এন আখতার, নজরুল ইসলাম সাধকপুরী, ফরিদ হোসেন, সৈয়দ মহিউদ্দিন প্রমুখ।

এই পর্বের জনপ্রিয় শিল্পীরা হলেন ফিরোজ সাঁই, শেফালী ঘোষ, জানে আলম, ফকির আলমগীর, কল্যাণী ঘোষ, আহমদ নূর আমিরী প্রমুখ।

উদ্ভব পর্বের মাওলানা আবদুল হাদী রচিত গানটি মাইজভাণ্ডারের সূচনা-সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

দমে দমে জপরে মন লা ইলাহা এল্লাল্লা
ঘটে ঘটে আছে জারি লা ইলাহা এল্লাল্লা।
… … …
মঞ্জেলে মঞ্জেলে মন গাউছ ধনের সিংহাসন
হাদীরে তলকিন করে লা ইলাহা এল্লাল্লা।।

এখানে আবদুল হাদী সম্পর্কে অলোচনা করা যায়। ফটিকছড়ির কাঞ্চনপুরে তাঁর জন্ম। মাওলানা হাদী গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর কামালিয়াত বিকাশের প্রথম পর্যায়ের খলিফাদের একজন, তিনি গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীকে তার রচিত গান গেয়ে শোনাতেন।

হযরত কেবলা প্রয়োজনমতো হাদীর গানে সংযোজন-বিয়োজন করে দিতেন। এ পর্যন্ত হাদীর ৯৪টি গানের সন্ধান পাওয়া গেছে। তার গান নিয়ে দুই খণ্ডে ‘রত্নভাণ্ডার’ নামে দুটি বই প্রকাশ করেছেন শাহজাদা সৈয়দ মুনিরুল হক।

মাওলানা হাদীর বিখ্যাত মাইজভাণ্ডারী গান ‘বিচ্ছেদের অনলে সদা অঙ্গ জ্বলে/বিনয় করিগো প্রিয়া আয় আয়রে…।’

উদ্ভব পর্বের মাওলানা বজলুল করিম মন্দাকীনির একটি গান…

আশি শরাবি চলেছি পন্থে, সরে দাঁড়াওরে যত সুফীগণ
লাগিবে গন্ধ হইবে মন্দ, মলিন হবে তোমার ছুফীতন।
… … …
আমি চলেছি শরাব খানা, যারি নেশাতে জগৎ দিওয়ানা
রুমি গিলানি মঈনে চিশতী, জোনায়েদ শিবলী হইল মগন।।
(প্রেমের হেম-বজলুল করিম মন্দাকীনি)

বরেণ্য আলেম বজলুল করিম মন্দাকীনি মাইজভাণ্ডারের প্রেমসাগরে ডুব দিয়ে নিজেকে জলাঞ্জলি দেওয়ার মর্সিয়া গেয়েছেন উপরিউক্ত গানে। তৎকালীন সময়ে পীর-মুর্শিদের প্রেমে উতালা হয়ে একজন আলেমের গান লেখা, গানবাজনায় (সেমা) মত্ত হওয়া অনেকটা সমাজচ্যুত হওয়ার শামিল।

হয়তো মাইজভাণ্ডারী তরিকায় দাখিল হওয়ায় তখন মাওলানা করিমকে সমাজ ও ধর্মের ধ্বজাধারীদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সইতে হয়েছে। তাই তিনি সবকিছুকে তুচ্ছ করে সমাজদ্রোহী হয়েছে উঠেছেন, মৌলবাদের ভ্রান্ত দৃষ্টিতে কিছুটা ধর্মদ্রোহীও।

তাইতো তিনি সুফিগণের (তথাকথিত ধার্মিক) উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমি শরাবি (মদমত্ত) পথে নেমেছি, তোমরা যত ভালো মানুষ সরে দাঁড়াও। নয়তো তোমাদের দামি পরিধেয় (ছুফীতন) নষ্ট হতে পারে।’

ওই গানে সমাজ ও ধর্মের ধ্বজাধারীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমরা সুখে বেহেস্তে যাবে, তু-হুর গেলমা কত কি পাবে/আমি বেচারা প্রেমেরি মরা, ঘুরে বেড়াব গহন কানন।’

সত্যি, মাইজভাণ্ডারের প্রেমসাগরে, যুগে যুগে অসংখ্য ‘প্রেমের মরা’ ঘুরে বেড়িয়েছেন, গানে গানে সুরে সুরে মুর্শিদের প্রশস্তি গেয়েছেন, প্রেমাষ্পদের একটুকু ভালোবাসার কাঙাল হয়ে সারাটি জীবন পার করেছেন।

মাইজভাণ্ডারী তরিকার আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য ও বিশ্বপ্রেক্ষাপটে এর তাৎপর্যপূর্ণ বিশেষত্ব সম্পর্কে সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী লিখেছেন, ‘প্রত্যেক বস্তুর বাঁচিয়া থাকার একটা রীতিনীতি আছে। মানব-সভ্যতা বাঁচিবারও নিশ্চয় একটা দিক নির্ণয়কারী রীতিনীতি আছে, যাহা মানবতা।

নৈতিক মানবতা যেই নীতিকে ধারণ করিয়া বাঁচে বা রক্ষা পায় তাহার অপর নাম সুফি সভ্যতা বা নৈতিক মানবধর্ম। ইহা দেশ-কাল ও জাতি-ধর্মের গণ্ডিমুক্ত।’ (সূত্র-গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী, শতবর্ষের আলোকে-ড. সেলিম জাহাঙ্গীর, পৃষ্ঠা-৫২)।

সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারীর উপরিউক্ত বক্তব্যই মাইজভাণ্ডারী গানের মূল চেতনা। এটা অবশ্য-স্বীকার্য যে, বাঙালি জাতিসত্তার মর্মমূল থেকে উদ্ভূত বলে মাইজভাণ্ডারী তরিকার যাবতীয় কর্মকা- বাংলা ভাষায়, ক্ষেত্রবিশেষে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় সম্পাদিত হয়ে আসছে।

বাংলা বর্ষপঞ্জিকা অনুসরণ করেই মাইজভাণ্ডারের বার্ষিক ওরশ ও খোশরোজ শরিফ অনুষ্ঠিত হয়। শতাব্দীকাল ধরে ১০ মাঘ গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর ওরশ (১৯০৭ সাল থেকে) অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ১৯৩৮ সাল থেকে বাবা ভাণ্ডারীর ওরশ হয়ে আসছে ২২ চৈত্র।

১৯৭১ সালে অনেক মুসলিম প্ল্যাটফরম মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও মাইজভাণ্ডারের প্রকাশ্যে অবস্থান ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই। গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী প্রপৌত্র শাহানশাহ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারীর রওজা শরিফের নির্মাণ-স্থাপত্যে ব্যবহৃত হয়েছে আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা।

সুতরাং এটা অবশ্য-স্বীকার্য যে, মাইজভাণ্ডারী দর্শন অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবধর্মের মাহাত্ম্য দ্বারা পরিচালিত এবং বাঙালি জাতিসত্তার মর্মমূল থেকে উদ্ভূত।

এই গান জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি তথা বিশ্বমানবের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষুধা নিবারণ করছে। তাই মাইজভাণ্ডারী দর্শনের শ্রেষ্ঠ অলংকার মাইজভাণ্ডারী গান আজ সাধনমার্গের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলার লোকসঙ্গীতের সখা, প্রমত্তদের পরানের ধন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়